‘বিজ্ঞাপনের আসল উদ্দেশ্য যা তা কিন্তু সফল হয়ে গিয়েছে’ লিখছেন প্রদোষ পাল

এই পোস্টটি শেয়ার করুন

বেশ কয়েকদিন ধরেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরছে এই ভিডিও এবং শেয়ার হচ্ছে হাজারে হাজারে! শ্রীরামপুরের একটি ফ্ল্যাট বিক্রির বিজ্ঞাপনে যে ভাবে  দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের বিখ্যাত ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা’ গানটির শব্দ বদলে দিয়ে ঐ গানের নকল  সুরে ঐ বহুতলের বিভিন্ন ‘ফেসিলটিস’ একের পর এক বর্ণন করছেন বাংলার এক নামজাদা শিল্পী এবং তাতে ঠোঁট মেলাচ্ছেন বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির স্বনামধন্য কয়েকজন অভিনেতা-অভিনেত্রী তা নজর এড়ায়নি বাংলার দর্শকদের এবং শেষমেশ প্রতিবাদী কণ্ঠে গর্জে উঠেছেন এক বঙ্গ ললনা আর সেই ভিডিওই এখন ভাইরাল ভিডিওটি ইউটিউবে প্রকাশিত হয়েছে “মান সম্মান বিক্রি করে ফ্ল্যাট কিনুন । This is how Bengali culture takes a dive” নামে ।তবে শুধুমাত্র গানের এই বিকৃতির দিক নয় বরং এই রকম একটি বিজ্ঞাপনের পরিপ্রেক্ষিতে বাঙালীর নীরবতাও যথেষ্ট চিন্তায় ফেলেছে কিছু মানুষকে।তেমনি একজন হলেন বাংলার প্রবীণ শিল্পী প্রদোষ পাল। এখানে সরাসরি তুলে দেওয়া হল তার ফেসবুক পোস্টটি

“দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা’ গান বিকৃত করে ফ্ল্যাট বিক্রির বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করায় অনেকেই ক্ষুব্ধ। বিজ্ঞাপনের পাল্টা একটি ভিডিও বাজারে জোর প্রচারিত হচ্ছে। আর যাই হোক বিজ্ঞাপনের আসল উদ্দেশ্য যা তা কিন্তু সফল হয়ে গিয়েছে। ক’জন মানুষ স্রেফ ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা’ গানকে বিকৃত করে ফ্ল্যাট বিক্রির বিজ্ঞাপনে কাজে লাগানো হয়েছে বলে প্রতিবাতে ফ্ল্যাট কেনা থেকে বিরত থাকবে? যে শ্রেণিরা এই সব দামী ফ্ল্যাট কেনে তাদের বিন্দুমাত্র কিছু যায় আসে এসবে? এ প্রজন্মের ক’জন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের নাম শুনেছে? তাদের ক’জন এই বিকৃত গানের আগে ‘ধন ধান্য’ গানটি শুনেছে। যারা ফ্ল্যাট বিক্রির বিজ্ঞাপনের জন্য এই গান বাজারে ছেড়েছে তারা ভালো করেই এ সব জানে। জানে বলেই এসব করে চলেছে আজ নয় অনেক দিন।
অঞ্জন দত্তের কোনও এক ছবির একটা গানে দেখেছিলাম, হুক্কা হুয়া! না, হু লা লা’র মধ্যে পিন্ডি চটকে রবীন্দ্র সংগীত’কে ঢুকিয়ে দেওয়া। সঙ্গে সে কি নাচ! ‘স্যাটা’ বোধহয় ছিল ‘আর্ট ফিলিম’? তেমন বিশেষ কেউ ‘পোতিবাদ’ করেছিল কী? বাঙালি নিজেরাই নিজেদের পেছন বহুদিন থেকেই তো মেরে চলেছে। 

দিন দুয়েক আগে ম্যাসেঞ্জারে একটা ভিডিও এলো। নিউমার্কেট অঞ্চলে একজন ভদ্রমহিলা’কে তাঁর ড্রাইভার সহ কিভাবে হেনস্থা করা হয়েছে তার উপাখ্যান। যারা হেনস্থা করছিল সবাই নাকি অবাঙালি। ওঁদের শাসাচ্ছিল, বাঙালিরা বেশি বাড়াবাড়ি করলে কেটে কুচিয়ে দেবে, ইয়্যাদি ইত্যাদি। ভদ্রমহিলার মূল বক্তব্য ছিল অবাঙালিরা কেমন করে বাড়ছে, কেমন করে বাঙালিদের পদানত করে রাখছে।

কে না জানে মূল কলকাতার প্রাণকেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ন জায়গা অবাঙালিদের দখলে! কিন্তু তারা তো জোর করে বাঙালিদের ভিটে মাটি উৎখাত করে দখল নেয়নি! আমারাই তাদের সাদরে অভর্থনা জানিয়েছি। পৈতৃক বাড়ি জায়গা বেচে ঠাঁই নিয়েছি গড়িয়া, সোনারপুর, ঠাকুরপুকুর, জোকা, বারাসত, আন্দুল বা মৌড়িগ্রামের পায়রার খুপরির দুই বা তিন কামরার ফ্ল্যাটে। বাপ ঠাকুর্দারা নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থে যা বানিয়েছিলেন আমদের মতো অকর্মার ঢেঁকিরা ঠ্যাঙের ওপর ঠ্যাং নাচিয়ে ফূর্তি মারার জন্য পায়রার খোপে থাকছি আর বাড়ি জমি বিক্রির জমানো টাকা ধ্বংস করছি। এর পর অবাঙালিরা হেনস্থা করলে কেঁদে ভাসিয়ে কী হবে?

অন্যভাবে নেবেন না, এটা তো রোজ রাস্তা ঘাটে দেখি, অবাঙালি বড়লোকের ছেলেদের দামী গাড়ি বা বাইকে করে হুস হুস করে উড়ে উড়ে ঘুরছে অনেক বাঙালি মেয়ে। খানা পিনার দেদার বন্দোবস্ত। তারাও মাসে মাসে বান্ধবী পাল্টাচ্ছে। বুঝে নিয়েছে ভাত ছড়ালে কাকের অভাব হয় না!

এই যে সব ঘটছে তা কি এমনি এমনি? আমাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ ছাড়া তো ঘটতে পারে না! তবুও চাইলে অনেক ক্ষেত্রেই আমরা কিছুটা ঠেকিয়ে রাখতে পারি না? ভেতর থেকে সত্যিই যদি অনুভব করি তাহলে তার কিছু ফল হতে বাধ্য। ছোটো বেলা থেকে যে গান প্রার্থনায় গেয়ে এসেছি সে গানের অপমান দেখে মাত্র দশজন চিঠি দিয়ে যদি ফ্ল্যাট বুকিং থেকে বিরত থাকে ভবিষ্যতে ওরা এধরণের বিকৃত কাজ করতে অন্তত দুবার ভাববে।

বিজ্ঞাপনের পাল্টা যিনি বা যাঁরা প্রচার করছেন তাঁরাও সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। বিশেষ করে যে ভদ্রমহিলা (ডানদিকে) উপস্থাপনা করেছেন এককথায় চমৎকার। আমি অভিভূত। খুবই সাহসী ও সঠিক ভাবে বিষয়টিকে জনগণের সামনে তুলে ধরেছেন। আর কীইবা করতে পারেন?
বাকীটা আপনারা কেমন ভাবে নেবেন আপনাদের ব্যাপার।

যাঁরা ভিডিওটি দ্যাখেননি নীচে লিংক দিলাম…” (লিখছেন শিল্পী প্রদোষ পাল)

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *