জিএমও (GMO)- এক মারণচাষ যা চলছে ভারতবর্ষেও! আপনি কতটা সুরক্ষিত?

এই পোস্টটি শেয়ার করুন

ভাগাড়কান্ড নিয়ে হইচই তো অনেক হল! তৎপর হয়ে উঠলো প্রশাসন, রেড চলল খাবার দোকানে-দোকানে , গ্রেপ্তার হলো মরা পশুর মাংসের কারবারিরা। বন্ধ হয়ে গেল অনেক হোটেল রেস্টুরেন্ট আর আপনি ভাবলেন যে এতদিন না হয় খারাপ খাবার দেয়া হচ্ছিল মানুষকে, যাক এবার তো বন্ধ হল! টিভির ব্রেকিং নিউজে ভেজাল তেল, নকল মসলার খবর দেখে আপনি থেকেথেকেই শিউরে ওঠেন আর মিডিয়াগুলো এমন ভাব দেখায় যেন আপনার সুরক্ষার যাবতীয় দায়িত্ব নিয়ে রেখেছে তারাই অথচ আপনি জানেনও না কিভাবে আপনার খাবারের ভেতর ঢোকানো হচ্ছে বিষ। হয়তো একথা বলতেই আপনার মাথায় আসছে কীটনাশকের কথা যা প্রত্যেকদিন শাক সবজির সাথে উঠে আসছে আমাদের প্লেটে কিন্তু সেখানেই শেষ নয় এখানে যেটা বলা হচ্ছে সেটা আরো ভয়াবহ!  মানুষের বিপুল খাদ্য-চাহিদা মেটানোর এ এক নতুন ব্যবসার মডেল যার জন্য দেশ-বিদেশে প্রচুর পয়সা নিয়ে খাটছে একদল ভ্রষ্ট বিজ্ঞানী আর তার সাথে জুটেছে মুনাফালোভী কর্পোরেট প্রভুরা যারা হয়ত আবার নির্বাচনের সময়  রাজনৈতিক দলগুলোকে পয়সাও যোগায়। কি সেই মডেল? সেই মডেল হল – GMO   

 আসুন আলোচনা করি GMO সম্পর্কে 

তাহলে জানুন GMO কথা। জি এম ও বা জি এম সি – Genetically Modified organism বা Genetically Modified Crop -জিন প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি শস্য যা উৎপাদন করার জন্য একটি উদ্ভিদের জিনের কাঠামো বদলে দেওয়া হয় যার ফলে হয়তো এক লাফে দশগুণ বেড়ে যেতে পারে উৎপাদনশীলতা- চাল কুমড়ার মাপে পাওয়া যেতে পারে আম ; পাঁচ কেজি ওজনের ঢ্যাঁড়স ফলানো যেতে পারে। বলাই বাহুল্য এতে প্রাথমিকভাবে খাদ্য উৎপাদন হয়ে যাবে সহজ কিন্তু তারপরই ঘনিয়ে  আসবে বিপদ ।

GMO র বিপদ

  • বিভিন্ন দেশে জি এম ও আসার পর থেকেই মানুষের দেহে ক্রনিক  বিভিন্ন রোগ খাদ্য এলার্জি এবং পৌষ্টিকতন্ত্রের ও জননতন্ত্রে বিভিন্ন রকমের গোলমাল দেখা গেছে  এবং যা ক্রমশই বাড়ছে। যদিও এখনো পর্যন্ত সম্পূর্ণ গবেষণার অভাব আছে। তবু ডাক্তাররা শারীরিক বিভিন্ন রোগের ক্ষেত্রে GMO খাবার  খেতে রোগীকে নিষেধ করছেন। এরই মধ্যে কথিত ভাবে বহু মানুষ অসুস্থ হয়েছেন বা মারা গেছেন GMO র প্রভাবে। আমাদের দেশে কতটা GM চাষ হচ্ছে এবং তাতে কিকি ক্ষতি হচ্ছে তা সম্পূর্ণতই অজ্ঞতার অতলে!
  • GMO চাষের ক্ষেত্রে একটি ভয়ংকর দিক হল এই  GMO যেখানেই চাষ হবে তার আশপাশের কয়েক কিলোমিটার ক্ষেত্র জুড়ে GMO ছড়িয়ে পড়বে এমনকি যারা জৈব চাষ করছেন তারাও রেহাই পাবেন না, বদলে যাবে গাছপালা এমনকি পশুপাখিরও জীবন চক্র।
  • এই চাষের পেছনে পয়সা ঢালছে মন্সেনটোর (Monsanto) মত কোম্পানি কারণ প্রচুর মুনাফা জড়িয়ে আছে  এই মারণ চাষে তাই  এ সম্পর্কে যেসব কৃষক বা বিজ্ঞানীরা খোঁজখবর নিয়েছেন অথবা তদন্ত করতে গেছেন তাদের উপর নেমে এসেছে আক্রমণ। 
  • পৃথিবীর  অধিকাংশ উন্নত দেশেই GMO কে হয় ব্যান করা হয়েছে নয়তো রাখা হয়েছে কঠিন নিয়মকানুনের বেড়াজালের ভিতর ।  NON-GMO PROJECT এর তথ্য  অনুযায়ী 60 টিরও বেশি দেশে GMO কে ব্যান করা হয়েছে অথবা আইন এর মাধ্যমে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে।
  • যেটা সবচাইতে ভয়ংকর ব্যাপার তা হল এখনও গবেষকরা পরিস্কার করে বলতে পারছেন না মানব বংশগতিতে এটা কি ধরনের প্রভাব ফেলবে ? যেহেতু এটি প্রাকৃতিক নিয়মের উপর এক কৃত্রিম কারিগরি তাই পরিষ্কারভাবেই বলা যায় যে এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারি।
  • GMO আসলে এক প্রকারের কৃষি-দাসত্ব কারণ এই শস্যের বীজ যেসব কৃষকেরা একবার ব্যবহার করবেন তারা অন্য কোন বীজ আর ব্যবহার করতে পারবে না। GM এর চাষ করতে হলে লাগবে বিশেষ বীজ, সার  ও রাসয়নিক যা থাকবে একচেটিয়া বিশেষ কোম্পানি গুলির অধিকারে  তাই আপনার খাদ্যের পুরো নিয়ন্ত্রণটাই চলে যাবে সেই সব কোম্পানির হাতে ।
  • সবচাইতে মারাত্মক যে ব্যাপারটি আপনি জানলে শিহরিত হয়ে যাবেন সেটা হল এই  Genetically Modified Crop প্রকৃতিতে এমন কিছু পরিবর্তন আনবে যা চাইলেও আর সংশোধন করা যাবে না বংশধারার ভেতরে ঢুকে যাবে এই Organism।
  • GMO র সাথে লড়াইও খুবই কঠিন তার কারণ 80% GM উদ্ভিদ এমন ভাবে তৈরি হয়েছে যা herbicide   বা আগাছানাশক যেকোনো ওষুধ সহ্য করতে পারে অর্থাৎ GM উদ্ভিদকে নষ্ট করাও হয়ে যাবে প্রায়  অসম্ভব !মনসেন্টো (Monsanto) নামক কোম্পানি (যারা GMO কৃষিতে সারা পৃথিবীতে কুখ্যাত ) নিজেরাই উদ্ভাবন করেছে   Toxic Glyphosate  নির্ভর  একপ্রকার  herbicide  (আগাছানাশক) আর এই একচেটিয়া ব্যবসা করে ১৯৯০ থেকে তাদের বিক্রি  বেড়ে গেছে ১৫ গুণ ।
  • GMO ক্রমশ প্রাকৃতিক বিভিন্ন শস্য, গাছপালা  পশুপাখির শরীরে ঢুকে যাচ্ছে সেই কারণে একে রোধ করাও হয়ে পড়েছে কঠিন! শুধু খাবারেই নয়,  জামাকাপড়, বিছানার চাদর এমনকি আপনার শিশুর জন্য ব্যবহার করা তোয়ালে র ভেতরও থাকতে পারে GM তুলো । আমেরিকার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ processed খাবারের ভেতরই GMO  আছে  বলে দাবী করা হচ্ছে।
bt cotton, farmers protest, monsanto
courtesy : Greenpeace

ভারতবর্ষে কি হতে চলেছে? 

ভারতবর্ষে  GMO বরাবরই  আলোচনার আড়ালে তাই দীর্ঘদিন ধরেই তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে মন্সেনটো । মহারাষ্ট্র ও  গুজরাটের একটা বিশাল অংশ জুড়ে তুলো চাষের উপর একচেটিয়া অধিকার  আছে  মন্সেনটোর (Monsanto)- যারা GMO এর সবচাইতে বড় উৎপাদক।  বিটি তুলো (Bt Cotton) চাষের ক্ষেত্রে যে বীজ ও সার প্রয়োজন তা খুবই উচ্চ মুল্যে বিক্রি করে মন্সেনটো (Monsanto), তাই ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েছে কৃষকেরা। ২০০৭ সালের পর থেকে ধীরেধীরে GMO র পরিধি বেড়েছে গুজরাতে। বিটি তুলোর চাষিদের মধ্যে প্রচুর আত্মহত্যার ঘটনা প্রশ্ন তুলেছে GM চাষের উপর। Competition Commission of India (CCI) ২০১৬ সালে মন্সেনটোর  (Monsanto) একচেটিয়া ব্যবসার উপর তদন্তের নির্দেশ দেয় যাকে দিল্লী হাই কোর্টে  চ্যালেঞ্জ জানায় মন্সেনটো।   কিছুদিন আগেই ভারতীয় কিষাণ সংঘ নামক একটি কৃষক সংগঠন গুজরাতে বেআইনি ভাবে GM সয়াবিন বিজের ব্যাবহার এর অভিযোগে সিবিআই  তদন্ত দাবী  করে। তাদের অভিযোগ ছিল ভারত সরকারের Genetic Engineering  Appraisal Committee (GEAC) এর বিরুদ্ধে। তবে একেবারে টাটকা খবর হল এই যে – আরও এক কুখ্যাত জার্মান কোম্পানি বেয়ার (Bayer) এর সাথে এক হয়ে গেছে মন্সেনটো  (Monsanto)  যাতে নাকি ভারতে তাদের ব্যাবসা করা আরো এক ধাপ সহজ হয়ে যাবে।

 

GM Mustard, protest, farmer, bayer, monsanto, GMO, GMC,
GM Mustard protest

এর আগেও কয়েকবার চেষ্টা হয়েছিল GM বেগুন বা  GM সর্ষে বাজারে আনার,  কিন্তু সফল হয়নি। যাই হোক ভারতের বিভিন্ন স্থানে বেআইনি ভাবে GM চাষের খবর পাওয়া যাচ্ছে। ইতি মধ্যেই শাসক দল বিজেপির এম পি দের শিক্ষামুলক ভ্রমনে নিয়ে গেছে  মন্সেনটো  (Monsanto), উদ্দেশ্য একটাই -কি ভাবে ভারতবর্ষে GM চাষ আরও বেশী করে করা যায়!  সর্বোপরি আশঙ্কা আরও বেড়ে উঠেছে যখন Food Safety and Standards Authority of India (FSSAI), (আমাদের খাদ্যের ব্যাপারে সরকারি যে সংস্থা দেখভাল করে) সম্প্রতি  একটি draft policy নিয়ে আসছে যেটা পরবর্তীতে আইন হতে পারে। এই ড্রাফট এর নাম food  safety and standard leveling and display regulation। যেখানে লেখা আছে যে 5 শতাংশের ওপর যদি একটি খাবারে GM উপকরণ থাকে তবেই সেই খাবারে  GM Food এর লেবেল লাগানো হবে অর্থাৎ ছাড় পেয়ে যাবে তার চাইতে কম পরিমানে GM উপকরণ সম্বলিত খাবার গুলি।  (বলাই বাহুল্য 5 শতাংশ এক্ষেত্রে একটা বিরাট অঙ্ক! বাইরের বিভিন্ন দেশে 0.1% GM থাকলেও সেইখানে GM লেখা  লেভেল লাগানো হয়) সরকার এই আইন লাগু করলে  অসুরক্ষার ভেতরে চলে যাবে আমাদের খাদ্যপণ্য যা শুধু মাত্র আমাদের নয় বরং আগামী প্রজন্মের ক্ষেত্রেও একটা মারাত্মক বিপদের পূর্বাভাস! বলা হচ্ছে যে ১০ই জুন পর্যন্ত আপনার যা কিছু মতামত বা পরামর্শ তা আপনি সরকারকে দিতে পারেন,  ইমেইল করেও আপনি আপনার বক্তব্য জানাতে পারেন ।

এ বিষয়ে আগাম সতর্কতা ও সচেতনতার জন্য একটি লাইভ ভিডিও প্রকাশ করেন সমাজকর্মী ধ্রুব রাঠি
যেখানে সরকারকে আপনার মতামত জানানোর জন্য আহবান করেন-

 

পাঠকদের কাছে অনুরোধ যে সরকারের এই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আপনার মতামত দিন এবং পিটিশনে সাক্ষর করুন

পিটিশনে সাক্ষর করতে এখানে ক্লিক করুন 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *