এবার আরেক মোদীর কেলেঙ্কারি?! আট হাজার কোটি টাকা কোথায় গেল?

“মোদী” উপাধির সাথেই যেন জড়িয়ে গেছে  প্রতারণা আর বদনাম। একদা প্রচারের কল্যাণে যে ভাবে “মোদী” শব্দ সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছিল “বিকাশ পুরুষ” “আচ্ছে দিন” ইত্যাদি শব্দবন্ধের, গত কয়েক বছরে সেভাবেই এই শব্দটি একের পর এক সমানে কলঙ্কিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জামানাতেই যে ভাবে ‘মোদী’রা দেশের টাকা লুট করে চম্পট দিয়েছে তাতে   প্রধানমন্ত্রীর উপরও মানুষের আস্থা এখন তলানিতে।

এগারোটা ব্যাগ নিয়ে বিজয় মালিয়া পালিয়ে গিয়েছিলেন তারপর একে একে ললিত মোদীও পালিয়ে গেলেন,  পালিয়ে গিয়েছিলেন নিরব মোদীও। তাই এখন প্রশ্ন উঠছে যে সরকারি ব্যবস্থার ভেতরেই কোন গলদ নেই তো? কারণ এভাবে সহজেই টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে যাচ্ছেন একের পর এক পুঁজিপতিরা। আপনারা ললিত মোদী বা নীরব মোদীর নামের সাথে ভালোভাবেই পরিচিত কিন্তু আপনারা কেউ কি এই তালিকার তৃতীয় নামটি শুনেছেন?  নাম তার মুকেশ মোদী!

ললিত ও নীরব মোদীর মতোই রাজস্থানের এই পুঁজিপতির বিরুদ্ধেও প্রায় সাড়ে আট হাজার কোটি টাকার ‘আত্মসাতের’ খবর ক্রমশ পরিস্কার হচ্ছে। ২০০০০০০  বিনিয়োগকারীর মোট অর্থের পরিমাণ ৮৪১০,০০০০০০০  কোটি টাকা । ঘনিষ্ঠ মহলের খবর অনুযায়ী বিনিয়োগকারীরা আজ সর্বশান্ত হওয়ার দিকে । প্রশ্ন উঠেছে এই মুকেশ মোদীর বিরুদ্ধে এখনো কেন কোনও পদক্ষেপ নিচ্ছে না সরকার? যদি সময় থাকতেই সরকার কোনো পদক্ষেপ না নেয় তবে অচিরেই হাওয়া হয়ে যেতে পারে  জনগণের ৮৪১০  কোটি টাকা। এই ‘জালিয়াতি’র সাথে যুক্ত সংস্থাটির নাম  ‘আদর্শ ক্রেডিট কোওপারেটিভ সোসাইটি’     এই Society মূলত মুকেশ মোদী ও তার পরিবারের দখলে রয়েছে। বর্তমানে সারা দেশে এই সোসাইটির ৮০৯ টি শাখা আছে এবং প্রায় ৩৫০০০০ এজেন্ট রয়েছে যাদেরকে ‘Society Member’ পদ দিয়ে রাখা হয়েছে, মেম্বার হওয়ার অর্থ তারাই এই সোসাইটিতে বিনিয়োগকারীদের  টাকা জমা করেন এবং যারা টাকা বিনিয়োগ করেন তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় ‘৫ বছরে টাকা দ্বিগুণ করে দেওয়া হবে’ এই মর্মে আর এই প্রতিশ্রুতির ফাঁদে পা দিয়েই  প্রায়  ২০ লক্ষ বিনিয়োগকারী এখানে টাকা রেখেছেন। সংস্থার ওয়েবসাইটে এ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ২০ লক্ষ মানুষের  ৮৪১০ কোটি টাকা জমা হয়েছে।

 

বিজয় মালিয়া ৯ হাজার কোটি টাকা এবং নীরব মোদী ১১.৫  হাজার কোটি টাকা নিয়ে চম্পট দিয়েছিলেন কিন্তু এরা প্রত্যেকেই আত্মসাৎ করেছিলেন ব্যাংক ঋণ কিন্তু মুকেশ মোদী টাকা তুলেছেন সাধারণ মানুষের কাছ থেকে। এবিপি নিউজ এর তদন্ত অনুযায়ী এই সোসাইটির পদাধিকারীরা অনেকেই ক্যামেরার সামনে মুখ খুলতে চাননি এবিপির  মতে এই সংস্থা যা কিনা ৮৪১০ কোটি টাকা জমা করেছে তা সুদসহ পরিমাণে দাঁড়িয়েছে প্রায় 13 থেকে 15 হাজার কোটি টাকা। এবিপি তাদের তদন্তের মাধ্যমে দখিয়েছে  এই সংস্থার হিসাবনিকাশের অসঙ্গতি তাদের মতে  শীঘ্রই ডুবতে চলেছে এই সংস্থা। সংস্থার আয়ব্যায় সংক্রান্ত বিভিন্ন খোঁজখবর নেয় এবিপি   এই সংস্থার বিভিন্ন ভূতপূর্ব আধিকারিকদের সাথে এবিপির কথোপকথন থেকে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য  এই সোসাইটির প্রাক্তন ডাইরেক্টর বিনয় কুম্পাবত বলেন” একটা টাকাও শোধ করতে পারবে না ওরা” ।   ভূতপূর্ব ডাইরেক্টর রাজেস্বর সিং বলেন “ সব কিছু মিলিয়ে মনে হয় না এই ব্যাবসা কোথাও পৌঁছবে, যে টাকা আমরা নিয়েছি তা মনে হয়না ফেরাতে পারব, আজ না হয় কাল ভেঙে যাবে সংস্থা, ভালো হয় যদি আগেই টাকা বার করে নেওয়া যায়” । বহু সাধারন মানুষ  এখানে তাদের রক্ত জল করা পয়সা গচ্ছিত রেখেছেন, প্রশ উঠেছে এই বিপুল পরিমান টাকা যদি না ফেরাতে পারে সংস্থা সে ক্ষেত্রে কি হবে?। এবিপি এর পর একজন এজেন্টের সাথেও যোগাযোগ করে, তার মতে এই স্কিমে “টাকা দ্বিগুন হ য়ে যাবে”। তবে সবচাইতে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসো সোসাইটির ভূতপূর্ব Chartered Accountant – সি মুন্দ্রা র কাছ থেকে . তিনি এবিপি কে জানান –  সংস্থার কর্তা মুকেশ মোদীর পিতা RSS সদস্য ছিলেন এবং ২০১৪ নির্বাচনে তার সদস্যপদ প্রায় ঠিক হয়ে গেছিল কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী তাকে টিকিট দিতে রাজি হননি। তার প্রার্থী হওয়া এতটাই নাকি সুনিশ্চিত ছিল যে তার ছবি দিয়ে  নাকি বড় বড হোরডিঙ  লেগে গেছিল সিরোহি শহরে ।

 

একদা নিতান্তই এক ইন্স্যুরেন্স এজেন্ট থেকে কিভাবে আজকে  মুকেশ মোদী এত বিপুল অর্থের মালিক হলেন ও অর্থনৈতিক উন্নতির শিখরে পৌছলেন তা এখনো রহস্যাবৃত। ২৭.০২.১৮ তারিখে প্রধানমন্ত্রী মোদী, অর্থমন্ত্রী ও CBDT কে চিঠি লিখে নবভারত পার্টি জানিয়েছে এই সোসাইটি  কিভাবে ভারত সরকারের ৩০০০০,০০০০০০০ কোটি টাকা লোকসান করেছে কিভাবে নোটবন্দীর  সময় কালো টাকা সাদা করার ব্যবসা করা হয়েছে এই সংস্থার মাধ্যমে, কিভাবে ক্রেডিট সোসাইটি হয়েও  এই সংস্থা ব্যাংকের মতো কাজ করছে  বেআইনি ভাবে।  সি মুন্দ্রা ABP কে জানান যে তিনি এই সব তথ্য PMO কে  দিয়েছিলেন এবং সেই ছবিও দেখিয়েছিলেন যেখানে মুকেশ মোদী সাথে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে দেখা যাচ্ছে কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোন উত্তর আসেনি। সি মুন্দ্রা এই সংস্থার  Chartered Accountant ছিলেন তাই তিনি এই সংস্থার কার্যকলাপের আদ্যন্ত জানেন বলে তার দাবী। তিনি বলেন যে এই সংস্থা পুরোপুরি বেআইনিভাবে কাজ করছে যা সবাই জানে এমনকি  Registrar ও জানেন কিন্তু কেউ কিছু করতে পারছে না। এবিপির রিপোর্ট অনুযায়ী এই বিপুল পরিমাণ অর্থ  মুকেশ মোদী অন্য কোম্পানিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে সরিয়ে ফেলছেন  । মুকেশ মোদী প্রায় আড়াইশো কোম্পানির সাথে যুক্ত । এই ধরনের কোম্পানি কে- shell company বলা হয় । shell কথার অর্থ শামুক অর্থাৎ এই কোম্পানিগুলির কোন ক্রিয়াশীলতা থাকেনা।  এরমধ্যে 17 টি  কোম্পানি যা সরাসরি মুকেশ মোদী বা তার পরিবারের সদস্যদের মালিকানাধীন। এর সবকটাই ক্ষতিতে চলে  তবু দলিলে দেখা যাচ্ছে এই Shell কোম্পানি গুলিই ১৩১৫ কোটি টাকা ঋণ করে রেখেছে আদর্শ সোসাইটি থেকে কিন্তু প্রশ্ন কেমন করে এই ঋণ শোধ হবে?  কোম্পানি গুলির হিসেবনিকেশ দেখে বোঝা যাচ্ছে যে কোম্পানিগুলির পক্ষে ঐ টাকা ফেরত দেওয়া প্রায় অসম্ভব। এ থেকে যা বোঝা যাচ্ছে নিজেরই বা নিজের পরিবারেরই মালিকানায় একাধিক shell কোম্পানি তৈরি করে টাকা এদিক-ওদিক করা হচ্ছে। কিন্তু shell কোম্পানিগুলির আদতে প্রায় কোনো অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। একাধিক কোম্পানির বিভিন্ন খাতে খরচ ও লোকসান দেখিয়ে টাকা সরিয়ে ফেলাটা এই ধরনের জালিয়াতির একটা খুব প্রসিদ্ধ ছক তাই  Adarsh Credit Cooperative Society-এর সামগ্রিক কার্যকলাপ একটা অশুভ ইঙ্গিত দিচ্ছে। ঠিক একই কায়দায় সারদা বা রোজভ্যালির মত কোম্পানি গুলোও ব্যাবসায় বিনিয়োগের নাম করে টাকা তুলেছিল আমাদের রাজ্যে যা পরবর্তীতে পুরোটাই আত্মসাৎ করে তারা যেখানে উঠে এসেছিল রাজ্যের শাসক দল তৃণমূলের একাধিক নেতা মন্ত্রীর নাম। যাই হোক  এই ঘটনা প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে দেশের আরও বহু Credit Society র ব্যাবসা সম্পর্কেও!  সারাদেশে এই মুহূর্তে ৯২৭৮৯  টি Credit Society চলছে যেখানে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ৮৪৬১৬ কোটি টাকা জমা আছে।  কতটা সুরক্ষিত সেই টাকা?

তথ্যসুত্রঃ ABP NEWS

One thought on “এবার আরেক মোদীর কেলেঙ্কারি?! আট হাজার কোটি টাকা কোথায় গেল?

  • June 15, 2018 at 7:22 pm
    Permalink

    এখুনি মুকেশ মোদীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, দেশের টাকার সুরক্ষার্থে।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *